নির্মল জীবন-১২ | ইমরান রাইহান

গল্পটা শুনেছি খতিবে আযম হাবিবুল্লাহ মিসবাহ রহিমাহুল্লাহর মুখে।

কৃষক সিদ্ধান্ত নিল ঘোড়াটা বিক্রি করে দিবে। কোনো কাজে আসে না। সারাদিন বসে থাকে। কে জানে হয়তো মরেও যেতে পারে। এর চেয়ে এটাকে বিক্রি করে দেয়াই ভালো। কৃষক ঘোড়া নিয়ে গেল বাজারে। বিক্রি করার জন্য একজন দালাল ঠিক করলো। দালাল বাজারের মাঝখানে এসে ঘোষণা দিলো, একটা ঘোড়া আছে। খুব স্বাস্থবান। দিনে একবেলা খেতে দিলেই হয়, সারাদিন একটানা কাজ করে যেতে পারে। এর পিঠে যত ওজনের জিনিসই চাপানো হোক, আপত্তি করে না। এর গতি তুফানের মত।

কৃষক কিছুক্ষণ মন দিয়ে দালালের কথা শুনলো। এরপর বললো, ভাই থামো। এত ভালো ঘোড়া আমি বিক্রি করবো না।

গল্পটা রুপক। তবে আমাদের জীবনের সাথে মিলালে দেখি, গল্পের কৃষকের সাথে আমাদের খুব একটা তফাত নেই। সুধারণা থেকে মানুষ আমাদের নানারকম প্রশংসা করে। আমরা নিজের প্রকৃত অবস্থান ভুলে গিয়ে সেই প্রশংসায় মজে যাই। ভাবি সত্যি সত্যিই আমরা এমন।

আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলতেন, হে ইবনুল মুবারক, তুমি তো নিজের অবস্থা সম্পর্কে জানো। এবার মানুষ তোমার সম্পর্কে যত প্রশংসাই করুক, তাতে তোমার ক্ষতি হবে না (অর্থাৎ, তুমি অহংকারী হয়ে উঠবে না)।

প্রশংসা শোনার একটা মজা আছে। নফস বারবার এর মজা নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে ভেতরে মানুষের প্রশংসা শোনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠে। এক পর্যায়ে প্রশংসা না শুনলে কষ্ট লাগে। আমলের ইখলাস চলে যায়, তার স্থান দখল করে রিয়া। তখন বান্দার বেশিরভাগ কাজই হয়ে উঠে অন্যকে দেখানোর জন্য।

সুফীরা বলতেন, মানুষ তোমার প্রশংসা করছে এই মানে এই নয় যে তুমি সত্যই এই প্রশংসার যোগ্য। তারা মূলত আল্লাহর সাত্তার গুনের প্রশংসা করছে, যে গুন দ্বারা আল্লাহ তোমার দোষত্রুটি ঢেকে রেখেছেন।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া বলেন, কোনো অন্তরে ইখলাস ও প্রশংসা শোনার আকাঙ্ক্ষা একত্রিত হতে পারে না।

ইমাম গাযালি বলেন, যে কারো অতিরিক্ত প্রশংসা করে সে কয়েকটি বিপদ টেনে আনে। প্রথমত, সে অতিরিক্ত প্রশংসা করতে গিয়ে মিথ্যা বলে। দ্বিতীয়ত, সে রিয়ার শিকার হয়। সে দেখাতে চায় প্রশংসিত ব্যক্তির প্রতি তার অনেক ভালোবাসা, কিন্তু হয়তো বাস্তবতা ভিন্ন। তৃতীয়ত, সে অন্যকে খুশী করার জন্য প্রশংসা করে। এবার সেই ব্যক্তি জালিম বা ফাসিক যাই হোক না কেন। অপরদিকে যার প্রশংসা করা হয় সেও দুটি সমস্যায় পড়ে যায়। এক, সে রিয়ায় আক্রান্ত হয়। দুই, সে নিজের অবস্থার উপরে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। পরে তার আমলে উন্নতি হয় না।

মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা মূলত প্রশংসিত ব্যক্তির বিপদ টেনে আনে।

একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে কারো ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রশংসা করতে শুনলেন। তিনি তখন বললেন, তুমি তো তাকে ধ্বংস করে দিয়েছো। তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছ। (মুসলিম, ৭৩৯৪)

অনলাইনের জগত প্রশংসা করা ও শোনার এক সহজ মাধ্যম। যারা অন্যের প্রশংসা করছি, যারা নিজের প্রশংসা শুনছি, আল্লাহ আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকার তাওফিক দিন। আমাদের মধ্যে পরিমিতিবোধ তৈরী করে দিন। জীবনের সকল কর্মে পরিমিতিবোধ এর পরিচয় দেয়ার তাওফিক দিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top