হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানভী (র) এর জন্ম ১৮৬৩ সালে, ভারতের উত্তর প্রদেশে। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম দিকের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। পড়াশোনা শেষে তিনি কানপুরের ফয়জে আম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। সারাজীবন তিনি লেখালেখি ও বয়ানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেছেন। একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। তাঁর বিভিন্ন রচনাবলী ও আলোচনা থেকে সংকলন করা কিছু কথা নিম্মে তুলে ধরা হল-
১.
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে শরিয়তের বিধি-বিধান নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা যায়। এর কারণ শিক্ষাব্যবস্থার কুপ্রভাব। এই শিক্ষার প্রভাবে মন থেকে আল্লাহ ও নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান উঠে যায়। যখন অন্তরে কারো প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান থাকে না, তখন তাঁর প্রতিটি আদেশের ব্যাপারে অন্তরে নানা প্রশ্ন ও সংশয় তৈরী হয়। একটা উদাহরণ দেখুন, বর্তমান সরকার (তখন ইংরেজদের শাসন চলছিল) মানুষের মনে এমনভাবে প্রভাব সৃষ্টি করেছে যে তাদের কোনো আদেশের ব্যাপারে কারো প্রশ্ন তোলার সাহস নেই। আর কেউ প্রশ্ন তুললেও এটুকুই জবাব দেয়া হয়, আরে ভাই আইন এমনই। কিন্তু শরিয়াহর ব্যাপারে দেখুন, মানুষ হাজার সংশয়ের জন্ম দিচ্ছে। হাজার প্রশ্ন তুলছে। ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ এমনই’ এই উত্তরকে কেউ যথেষ্ট মনে করছে না। এর কারণ, অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা নেই, সম্মান নেই।
– এই বক্তব্য দ্বারা তারা উদ্দেশ্য, যারা ফরজ পরিমান ইলম এবং শরিয়াহর মৌলিক জ্ঞান অর্জন না করেই আধুনিক শিক্ষা গ্রহন করেন। তাদের মধ্যে এই শিক্ষার কুপ্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। যারা ফরজ ইলম অর্জন করেন, নিয়মিত আলেমদের সোহবতে আসা যাওয়া করেন, তারা আধুনিক শিক্ষা গ্রহন করলেও এই কুপ্রভাব থেকে অনেকটাই নিরাপদ ইনশাআল্লাহ।
২.
ভালো পোশাক পরতে কোনো সমস্যা নেই, যদি এর দ্বারা অহংকার প্রদর্শন উদ্দেশ্য না হয়। অনেক সময় দেখা যায় একাকি অবস্থায় একেবারে সাধারণ পোশাক পরা হয়, কিন্তু মানুষের সামনে আসলে খুব উন্নত পোশাক পরিধান করা হয়। এজন্য উচিত নিজের মনের দিকে খেয়াল রাখা। সেখানে অহংকার প্রদর্শনের ইচ্ছা আসছে কিনা তা পর্যবেক্ষন করা।
৩.
যেকোনো কাজ বিচক্ষণতা ও হেকমতের সাথে করা উচিত। হজরত নানুতুবী একবার রামপুর সফর করেছিলেন। তার আগমনের সংবাদ পেয়ে রামপুরের নবাব তাকে নিজের প্রাসাদে দাওয়াত করেন। হজরত নানুতুবী জবাব দিয়েছিলেন, আমি গ্রাম্য মানুষ। নবাবদের দরবারের আদব সম্পর্কে অবগত নই। তাই আমার না আসাই ভাল। এই কথার মাধ্যমে একদিকে তিনি নবাবের দাওয়াত এড়িয়ে গেলেন, আবার বাহ্যিকভাবে কোনো শত্রুতা বা তিক্ততাও তৈরী হল না।
৪.
মেহমানের সম্মান করা অনেক জরুরি বিষয়। যদি মহাত্মা গান্ধীও আমার কাছে আসে আমি তাকে মেহমান হিসেবে প্রাপ্য সম্মান দিব। কিন্তু একটা বিষয়ে খুব সতর্ক থাকবো, সে যেন এখানে তাঁর কোনো চিন্তা প্রচার করতে না পারে।
– হজরত থানভী এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। বিকৃত চিন্তা ও মতবাদ লালন করে এমন কারো সাথে দেখা হলে বাহ্যিক সদ্ভাব নিয়ে সাক্ষাত হতে পারে, কিন্তু তাকে তাঁর চিন্তা প্রচার করতে দেয়া যাবে না।
৫.
আমার অভিজ্ঞতা হলো, যাদের সামনে কোনো উদ্দেশ্য থাকে, এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জনে তারা কাজ করতে থাকে, তাদের মনে সংশয় সন্দেহ কম আসে। আর কখনো আসলেও সামান্য ইশারাতেই তা দুর হয়ে যায়। যারা অলস, গাফেল তাদের অন্তরেই সন্দেহ সংশয় শক্ত দানা বাধে। মনে করুন, একজন এখান থেকে দিল্লি যাবে। পথে হয়তো কোথাও সে রাস্তা হারালো, তাঁর সন্দেহ হলো। এখন সে কাউকে জিজ্ঞেস করে সহজেই পথ পেয়ে যাবে, আবার চলতে শুরু করবে। একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন। তাকে খাবার দেয়া হলে চাল কোথেকে আসলো, কতক্ষন ধরে তা সিদ্ধ করা হয়েছে এসব প্রশ্ন তাঁর মাথায় আসবে না। সে খাবার খেতেই ব্যস্ত থাকবে। সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা এমনই ছিল। তারা শরিয়তের প্রতিটা আদেশ মানতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন, এসব নিয়ে তাদের মনে সন্দেহ সংশয় আসেনি। কখনো সামান্য সন্দেহ এলেও নবিজির ইশারাতেই তা দূর হয়ে গিয়েছিল।
– শরিয়াহর কোনো বিধান বুঝে না আসলে তা আলেমদের কাছে বুঝে নিতে কোনো সমস্যা নেই। এখানে হজরতের বক্তব্য তাদের উদ্দেশ্যে, যারা অনর্থক নানা সন্দেহ সংশয় মনে পুষে।
৬.
একজন ব্যক্তি বড় চমৎকার একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আকল হলো তা যা আল্লাহকে পেয়ে যায়, আর আল্লাহ হলেন তিনি, আকল যাকে ধারণ করতে পারে না। আল্লাহকে পাওয়ার অর্থ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে সদা চেষ্টা করা। গাফেল না থাকা।
৭.
সগিরা গুনাহকে সগিরা গুনাহ বলা হয়, কবিরা গুনাহের সাথে তুলনা করে। গুনাহ দুটিই। দুটিতেই আল্লাহর নাফরমানি বিদ্যমান। আগুনের ছোট একটি ফুলকি থেকেও অনেক সময় সুত্রপাত ঘটে বিরাট অগ্নিকান্ডের। আগুনের ফুলকি যত ছোটই হোক, তা তুচ্ছ করে দেখা যায় না। গুনাহের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমন। গুনাহ ছোট না বড় সে চিন্তা করার আগে চিন্তা করা উচিত, আমি কার নাফরমানি করছি? তিনি কত বড়।
৮.
আমি অযথা বিতর্ক ও তর্কাতর্কি এড়িয়ে চলি। হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি (র) আমাকে একটি উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, লোকজন বিতর্ক করতে এসেছে বুঝলে তাদের সামনে সবগুলো মত উল্লেখ করে নিজে সরে যাবে। যেমন, এক ব্যক্তির কয়েকটা চুল পেকে গেলে সে নাপিতের কাছে গিয়ে বললো, আমার পাকা চুলগুলো তুলে দাও। নাপিত তাঁর পুরো মাথা ন্যাড়া করে সব চুল সামনে রেখে বললো, আপনি নিজেই এবার পাকা চুল আলাদা করে নিন, আমার এত সময় নেই’। আমি সারাজীবন হজরতের এই উপদেশ মেনে চলেছি।
৯.
অন্তরকে পর্যবেক্ষনে রাখা জরুরি। এর অবস্থা ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়।
১০.
মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস থেকে বাঁচার উপায় হলো, যার কাছে মিথ্যা বলেছে তাকে বলে আসবে, ভাই ওই কথাটা আমি মিথ্যা বলেছিলাম। এভাবে কিছুদিন করলে এই অভ্যাস অনেকটাই কেটে যাবে।